ঢাকা ১১:১৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৫, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

ঝিনাইদহের গ্রামে গ্রামে উপসর্গ নিয়ে মানুষের মৃত্যু

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৯:৩৪:৩৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ জুলাই ২০২১
  • ৩৭৬ বার পড়া হয়েছে।

বিশেষ প্রতিনিধি:

ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার একতারপুর গ্রামের ছনু বিশ্বাস করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা যান গত ২৮ জুন। পাঁচদিন পর ৩ জুলাই একই উপসর্গ নিয়ে মারা যান তার ভাইয়ের স্ত্রী আনোয়ারা বেগম এবং মেয়ে রাবেয়া খাতুন। ৪ জুলাই মারা যান ছনুর আরেক ভাই আব্দার হোসেন।

ছয় দিনের ব্যবধানে পরিবারের চারজন এভাবে একে একে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেও তারা চিকিৎসকের দ্বারস্থ কিংবা করোনা পরীক্ষা করাননি।

উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নে করোনা উপসর্গ নিয়ে একই ভাবে দশ থেকে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের কোনো পরীক্ষা করা হয়নি।

ভারতের সীমান্তবর্তী মহেশপুর উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম সিরাজ এসব তথ্য জানিয়ে বললেন, মারা যাওয়া ওই চারজনেরই সর্দি-জ্বর্র ছিল। চেয়ারম্যানের ভাষ্যমতে, মহেশপুরের গ্রামগুলোতে ঘরে ঘরে মানুষ জ্বরে ভুগছেন। বাড়িতে বসেই সাধারণ জ্বরের চিকিৎসা নিচ্ছেন তারা। শুধু শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যা হলে চিকিৎসকের কাছে যাচ্ছেন।

স্থানীয় ইউপি সদস্য জহুরুল ইসলাম জানান, তাদের এলাকার অনেক মানুষই গত দুই মাসে ভারত থেকে ফিরেছেন। পরীক্ষায় তাদের অনেকের কোভিড-১৯ ধরাও পড়ে। এরপর থেকে গ্রামগুলোতে জ্বরের প্রকোপ শুরু হয়। মহেশপুরের মতো গোটা জেলায় ঘরে ঘরে দেখা দিয়েছে জ্বর-সর্দি। পরিবারে একজন জ্বরে আক্রান্ত হলে অন্য সদস্যরাও হচ্ছেন দ্রুতই।

জ্বর থেকে সেরে ওঠা ব্যাপারীপাড়ার ব্যবসায়ী সাহারুল বারী তিনি জানান, এবারের জ্বর অন্যবারের তুলনায় ভিন্ন। অন্যান্য সময়ে জ্বরের সঙ্গে সর্দি-কাশি থাকলেও শরীরে ব্যথা ছিল না। এবার অনেকেই শরীরে ব্যথা অনুভব করছেন। একবার শুরু হলে সপ্তাহ পেরিয়েও ছাড়ছে না জ্বর। মুখে স্বাদ ও নাকে গন্ধ থাকছে না। জ্বর চলে গেলেও শরীর দুর্বল হয়ে থাকছে।

এদিকে, এই জ্বরে পরিবারের শিশুরাও আক্রান্ত হচ্ছে। অনেকের আবার তাপমাত্রা কমলেও শ্বাসে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। তবে তাদের খুব কমই করোনার পরীক্ষা করাচ্ছেন। ফলে জেলায় কতজন করোনা রোগী আর কতজন মৌসুমি জ্বরে আক্রান্ত তা নিশ্চিত বলতে পারছে না ঝিনাইদহ স্বাস্থ্য বিভাগ।

তবে যে জ্বরই হোক না কেন, শুরুতে রোগীকে আইসোলেশনে চলে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন ঝিনাইদহের করোনা ইউনিটের চিকিৎসক ডা. জাকির হোসেন। মাস্ক পরার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি।

এদিকে ঝিনাইদহে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা ও এই রোগের উপসর্গ নিয়ে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়াও নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ১৪৪ জন।

ঝিনাইদহের সিভিল সার্জন ডা. সেলিনা বেগম জানান, বৃহস্পতিবার সকালে ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়া ল্যাব থেকে ৪৬৮ জনের নমুনা পরীক্ষার ফলাফল এসেছে। এদের মধ্যে ১৪৪ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। শনাক্তদের মধ্যে সদরের ৫৪ জন, শৈলকুপার ২০, হরিণাকুণ্ডুর সাত, কালীগঞ্জের ৩০, কোটচাঁদপুরে ১৮ এবং মহেশপুরে রয়েছেন ১৫ জন। পরীক্ষা বিবেচনায় আক্রান্তের হার ৩০ দশমিক ৭৬ ভাগ। এ নিয়ে জেলায় মোট করোনা শনাক্তের সংখ্যা পাঁচ হাজার ৩২০তে দাঁড়ালো।

ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হারুন অর রশিদ জানান, করোনাভাইরাস আক্রান্তদের বেশিরভাগই এখন গ্রামের মানুষ।

তিনি বলেন, ‘জ্বর-সর্দি নিয়ে মানুষ বাড়িতেই থাকছে। যখন শ্বাসকষ্ট হচ্ছে, তখনই হাসপাতালে ছুটে আসছে। শেষ সময়ে আসায় অনেককেই আমরা বাঁচাতে পারছি না।’

ক’দিন আগে নিজের মুমূর্ষু স্ত্রীকে নিয়ে গভীর রাতে ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে গিয়েছিলেন ঝিনাইদহ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদ হাসান টিপু। ওই রাতের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি জানান, মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ২০টি মাইক্রোবাসে করে করোনা উপসর্গ নিয়ে রোগীরা গ্রাম থেকে হাসপাতালে আসলেন।

Tag :

ঝিনাইদহের গ্রামে গ্রামে উপসর্গ নিয়ে মানুষের মৃত্যু

Update Time : ০৯:৩৪:৩৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ জুলাই ২০২১

বিশেষ প্রতিনিধি:

ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার একতারপুর গ্রামের ছনু বিশ্বাস করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা যান গত ২৮ জুন। পাঁচদিন পর ৩ জুলাই একই উপসর্গ নিয়ে মারা যান তার ভাইয়ের স্ত্রী আনোয়ারা বেগম এবং মেয়ে রাবেয়া খাতুন। ৪ জুলাই মারা যান ছনুর আরেক ভাই আব্দার হোসেন।

ছয় দিনের ব্যবধানে পরিবারের চারজন এভাবে একে একে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেও তারা চিকিৎসকের দ্বারস্থ কিংবা করোনা পরীক্ষা করাননি।

উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নে করোনা উপসর্গ নিয়ে একই ভাবে দশ থেকে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের কোনো পরীক্ষা করা হয়নি।

ভারতের সীমান্তবর্তী মহেশপুর উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম সিরাজ এসব তথ্য জানিয়ে বললেন, মারা যাওয়া ওই চারজনেরই সর্দি-জ্বর্র ছিল। চেয়ারম্যানের ভাষ্যমতে, মহেশপুরের গ্রামগুলোতে ঘরে ঘরে মানুষ জ্বরে ভুগছেন। বাড়িতে বসেই সাধারণ জ্বরের চিকিৎসা নিচ্ছেন তারা। শুধু শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যা হলে চিকিৎসকের কাছে যাচ্ছেন।

স্থানীয় ইউপি সদস্য জহুরুল ইসলাম জানান, তাদের এলাকার অনেক মানুষই গত দুই মাসে ভারত থেকে ফিরেছেন। পরীক্ষায় তাদের অনেকের কোভিড-১৯ ধরাও পড়ে। এরপর থেকে গ্রামগুলোতে জ্বরের প্রকোপ শুরু হয়। মহেশপুরের মতো গোটা জেলায় ঘরে ঘরে দেখা দিয়েছে জ্বর-সর্দি। পরিবারে একজন জ্বরে আক্রান্ত হলে অন্য সদস্যরাও হচ্ছেন দ্রুতই।

জ্বর থেকে সেরে ওঠা ব্যাপারীপাড়ার ব্যবসায়ী সাহারুল বারী তিনি জানান, এবারের জ্বর অন্যবারের তুলনায় ভিন্ন। অন্যান্য সময়ে জ্বরের সঙ্গে সর্দি-কাশি থাকলেও শরীরে ব্যথা ছিল না। এবার অনেকেই শরীরে ব্যথা অনুভব করছেন। একবার শুরু হলে সপ্তাহ পেরিয়েও ছাড়ছে না জ্বর। মুখে স্বাদ ও নাকে গন্ধ থাকছে না। জ্বর চলে গেলেও শরীর দুর্বল হয়ে থাকছে।

এদিকে, এই জ্বরে পরিবারের শিশুরাও আক্রান্ত হচ্ছে। অনেকের আবার তাপমাত্রা কমলেও শ্বাসে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। তবে তাদের খুব কমই করোনার পরীক্ষা করাচ্ছেন। ফলে জেলায় কতজন করোনা রোগী আর কতজন মৌসুমি জ্বরে আক্রান্ত তা নিশ্চিত বলতে পারছে না ঝিনাইদহ স্বাস্থ্য বিভাগ।

তবে যে জ্বরই হোক না কেন, শুরুতে রোগীকে আইসোলেশনে চলে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন ঝিনাইদহের করোনা ইউনিটের চিকিৎসক ডা. জাকির হোসেন। মাস্ক পরার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি।

এদিকে ঝিনাইদহে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা ও এই রোগের উপসর্গ নিয়ে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়াও নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ১৪৪ জন।

ঝিনাইদহের সিভিল সার্জন ডা. সেলিনা বেগম জানান, বৃহস্পতিবার সকালে ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়া ল্যাব থেকে ৪৬৮ জনের নমুনা পরীক্ষার ফলাফল এসেছে। এদের মধ্যে ১৪৪ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। শনাক্তদের মধ্যে সদরের ৫৪ জন, শৈলকুপার ২০, হরিণাকুণ্ডুর সাত, কালীগঞ্জের ৩০, কোটচাঁদপুরে ১৮ এবং মহেশপুরে রয়েছেন ১৫ জন। পরীক্ষা বিবেচনায় আক্রান্তের হার ৩০ দশমিক ৭৬ ভাগ। এ নিয়ে জেলায় মোট করোনা শনাক্তের সংখ্যা পাঁচ হাজার ৩২০তে দাঁড়ালো।

ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হারুন অর রশিদ জানান, করোনাভাইরাস আক্রান্তদের বেশিরভাগই এখন গ্রামের মানুষ।

তিনি বলেন, ‘জ্বর-সর্দি নিয়ে মানুষ বাড়িতেই থাকছে। যখন শ্বাসকষ্ট হচ্ছে, তখনই হাসপাতালে ছুটে আসছে। শেষ সময়ে আসায় অনেককেই আমরা বাঁচাতে পারছি না।’

ক’দিন আগে নিজের মুমূর্ষু স্ত্রীকে নিয়ে গভীর রাতে ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে গিয়েছিলেন ঝিনাইদহ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদ হাসান টিপু। ওই রাতের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি জানান, মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ২০টি মাইক্রোবাসে করে করোনা উপসর্গ নিয়ে রোগীরা গ্রাম থেকে হাসপাতালে আসলেন।